আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০:৪৪, ৩রা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৫ই শাওয়াল, ১৪৪৬ হিজরি
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু একটি প্রতিরক্ষা বাহিনী নয়; এটি আমাদের জাতীয় ঐক্য, সংহতি ও গৌরবের প্রতীক। জাতির প্রতিটি ক্রান্তিকালে এই বাহিনী তার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে এগিয়ে এসেছে নিরলসভাবে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও শান্তি রক্ষায় তাদের অবদান অনস্বীকার্য। তারা কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের যোদ্ধাই নয়, শান্তির সময়েও তারা জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে, সংকট উত্তরণে পথ দেখিয়েছে।
তাদের ত্যাগ, নিষ্ঠা ও আত্মদান আমাদের গর্বের উৎস। কিন্তু আজ এই মহান প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে কিছু অপ্রিয় বিতর্ক ও ষড়যন্ত্রের চেষ্টা চলছে, যা মোটেও কাম্য নয়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাস আমাদের জাতীয় সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়।
এরপরও নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল নুরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী জনতার কাতারে শামিল হয়ে গণতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করেছিল। যদি তারা স্বৈরশাসকের পক্ষে থাকত, তাহলে হয়তো বাংলাদেশকে আরও দীর্ঘ সময় অন্ধকারে থাকতে হতো। ঠিক একইভাবে, গত ৫ আগস্টের ঘটনায় সেনাবাহিনীর গণমুখী ভূমিকা দেশকে গৃহযুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করেছে।
তাদের বিচক্ষণতা ও নেতৃত্বে দেশের রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে। তাদের এই ত্যাগ ও সদিচ্ছাকে কোনোভাবেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
বর্তমান সময়েও সেনাবাহিনী দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, সামাজিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও তারা মাঠে থেকে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। গত সাত মাস ধরে তারা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।
পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীর উপস্থিতি দেশব্যাপী অরাজকতা রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাদের এই ত্যাগী ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, তাদের অবদান ছাড়া দেশের পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ত।
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের কথায় ফিরে যাই। তিনি বলেছেন, ‘আমার একটাই আকাঙ্ক্ষা—এ দেশ এবং জাতিকে একটা সুন্দর জায়গায় রেখে আমরা সেনানিবাসে ফেরত আসব।’ এই কথাগুলো শুধু একটি বক্তব্য নয়, এটি সেনাবাহিনীর চেতনা ও আদর্শের প্রতিফলন। তারা কখনোই ক্ষমতার লোভে মত্ত হয়নি। পাকিস্তান বা আফ্রিকার কিছু দেশের মতো বাংলাদেশের সেনাবাহিনী কখনোই ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেনি। বরং তারা সব সময় দেশ ও জনগণের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছে।
তবে দুঃখের বিষয়, এই মহান বাহিনীকে নিয়ে কিছু মহল থেকে নানা ষড়যন্ত্র ও বিতর্ক ছড়ানোর চেষ্টা চলছে। তাদের নজিরবিহীন ত্যাগ ও অবদানকে সংকীর্ণ স্বার্থে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। এ ধরনের অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের কোনো স্থান আমাদের সমাজে থাকা উচিত নয়। কারণ, সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করার অর্থ হলো দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলা। তাদের প্রতি আস্থা রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আমাদের গর্ব, আমাদের শক্তি। তারা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জীবন উৎসর্গের শপথ নিয়েছে। তাদের এই আত্মত্যাগের কোনো তুলনা নেই। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পুলিশ বা র্যাব—কাউকেই এ ধরনের শপথ নিতে হয় না। এই অসামান্য ত্যাগের দাবিদার একমাত্র সেনাবাহিনী। তাদের সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। তাদের প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অবশ্যই অটুট থাকবে।
আমরা যেন ভুলে না যাই, সেনাবাহিনী আমাদের ক্রান্তিকালের কাণ্ডারি। তারা আমাদের শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের রক্ষাকারী। তাদের প্রতি আমাদের আস্থা ও ভালোবাসা যেন কোনো দিন কম না হয়। কারণ, তাদের শক্তিতেই আমরা নিরাপদ, তাদের ত্যাগেই আমরা গর্বিত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি—এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী